নারী দিবস ২০২৫: ৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে মূলধারা জারি ও প্রতিক্রিয়া

প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়, যা নারী অধিকার, সমতা এবং ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত। ২০২৫ সালে এই দিবসটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ এটি গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী মূলধারার (mainstream narrative) প্রচার ঘটিয়েছে। এই বছরের প্রতিপাদ্য, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের নীতিমালা এবং সামাজিক আলোচনার গতিপথ অনেকটাই পরিবর্তন এনেছে। তবে, এই পরিবর্তনকে ঘিরে যেমন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে, তেমনি সমালোচনাও উঠেছে।
মূলধারা ও এর প্রভাব
এবারের নারী দিবসের মূলধারা ছিল "সবার জন্য সমান সুযোগ: নারী ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা"। এই প্রতিপাদ্যের আওতায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে:
১. নারী নেতৃত্ব ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন: নারীদের ব্যবসা ও কর্মক্ষেত্রে আরও সুযোগ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারি ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নারী নেতৃত্ব বাড়ানোর জন্য বিশেষ নীতিমালা গৃহীত হয়েছে।
২. সমান বেতন ও কর্মস্থলের বৈষম্য দূরীকরণ: বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নারীদের জন্য সমান বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে নতুন শ্রম আইনও বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
৩. নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়তা: ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং ভর্তুকি ঘোষণা করা হয়েছে।
৪. প্রযুক্তি ও শিক্ষা খাতে নারীদের অংশগ্রহণ: বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) খাতে নারীদের উপস্থিতি বাড়াতে নতুন শিক্ষাবৃত্তি এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু হয়েছে।
৫. নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ: নারী নির্যাতন ও হয়রানির বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইন এবং জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া :
অনেক নারী অধিকার কর্মী ও সংস্থা এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলছেন, এই উদ্যোগ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করবে এবং সমাজে সমতার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করবে। কর্মজীবী নারীরা বেতন সমতার বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিশ্রুতি দেখে আশাবাদী।
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, STEM খাতে নারীদের জন্য বাড়তি সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে, যা অর্থনীতিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে।
সমালোচনা ও বিতর্ক :
তবে, এই পরিবর্তনগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু বিতর্কও উঠেছে। সমালোচকদের মতে,
১. নীতির বাস্তবায়ন অনিশ্চিত: অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ঘোষিত নীতিগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে? অতীতেও এমন অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তা সফলভাবে প্রয়োগ হয়নি।
২. নারী-পুরুষ সমতা নাকি পক্ষপাত? কিছু মহল বলছে, নারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ফলে পুরুষ কর্মীদের প্রতি বৈষম্য তৈরি হতে পারে।
৩. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের অভাব: শুধুমাত্র নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না, বরং সমাজের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। অনেক কর্মক্ষেত্রে এখনো নারীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে, যা আইন ও নীতির মাধ্যমে একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
৪. গ্রামীণ নারীদের অন্তর্ভুক্তি: বেশিরভাগ উদ্যোগ শহরভিত্তিক, ফলে গ্রামীণ নারীরা এখনো উন্নয়নের মূলধারার বাইরে রয়ে যাচ্ছে।
নারী দিবস ২০২৫ একদিকে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে বাস্তবায়ন ও অন্তর্ভুক্তির দিক থেকে অনেক প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে। নারীদের উন্নয়ন ও সমতার জন্য শুধুমাত্র সরকারি বা কর্পোরেট উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক পরিবর্তন, পারিবারিক সমর্থন এবং ব্যক্তিগত সচেতনতারও প্রয়োজন।
অতএব, এবারের নারী দিবস শুধু একটি উদযাপন নয়, বরং এটি আমাদের জন্য একটি আত্মবিশ্লেষণের সুযোগ—আমরা কি সত্যিই সমতার পথে এগোচ্ছি, নাকি শুধুমাত্র নীতিগত প্রতিশ্রুতিতেই আটকে আছি?